• রবিবার (সকাল ৭:৫৮)
    • ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

মাছের বিনিময়ে মাদকঃ সৃষ্টিশীল অপরাধের গল্প

ডেস্ক রিপোর্টঃ

“আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অন্যরকম এক ‘বার্টার ট্রেড’: দুই বন্ধুর অভূতপূর্ব সৃষ্টিশীলতা” শিরোনামে একটি বাস্তব গ্রেফতারের ঘটনার মূল ভূমিকায় ছিলেন তিনি। সৃষ্টিশীল ও ক্ষুরধার লেখনি শক্তির অধিকারী শামীম আনোয়ার একজন RABকর্মকর্তা। RAB ৯ এ কর্মরত। তার মুখেই শুনি গ্রেফতার হওয়া একজন সৃষ্টিশীল অপরাধ কর্মীর  আটকের ঘটনা।।।

“নাম তার মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন (২৫)। পেশায় মাছ ব্যবসায়ী। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেঘুরে জেলে- মাছচাষীদের নিকট থেকে মাছ ক্রয় করে বড় বড় আড়তে সাপ্লাই দেওয়াই তার কাজ। আয় উপার্জন যা হয়, তাতে দুই বাচ্চা আর একমাত্র বউ নিয়ে তার সুখের সংসার কোন রকম চলে যায়। নাম, পেশা আর জীবনধারার বর্ণনা শুনে আপনারা যারা বোরহান সাহেবকে ইমানদার এক সাচ্চা আদমি ভাবছেন, তারা আশাহত হবেন শিগগিরই। তাজ্জব হবেন তার অভূতপূর্ব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি, ধরন আর অনন্য কৌশল দেখে।

চিন্তার পালাবদলঃ
সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ভারত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমারেখার ৪০০ গজ দূরত্বে রাজাপুর গ্রামে বোরহানের পৈতৃক বসতভিটা অবস্থিত। দরিদ্র পরিবারের সন্তান। পেশায় কৃষক পিতা আব্দুল কলেক ৫ ছেলেমেয়ের কাউকেই পড়াশুনা তেমন করাতে পারেন নি। ২০১২ সালে ৮ম শ্রেনীতে পড়ার সময় পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে মাছ ব্যবসায় হাত পাকানো বোরহানের। আয়-ইনকামও ভালই। কিন্তু এভাবে বছর দুয়েক চলার পর তিনি উপলব্ধি করতে সমর্থ হন যে, এভাবে মাছ বিক্রির সোজাসাপ্টা পথে হেঁটে ‘দিন যাওয়া- রাত পোহানো ‘ সম্ভব হলেও এতে করে ভাগ্যের চাকা ঘোরানো নিতান্তই অসম্ভব এক ব্যাপার। একটু বাঁকা রাস্তায় চলতে হবে। কতো লোক চোখের সামনে দিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেল, আর বোরহান পড়ে আছেন সেই মাছের খাচি ঝাঁকানো নিয়ে। কি করা যায়, কি করা যায়… বোরহান ভাবতে থাকেন। কিন্তু এ ভাবনার যেন কোন কূল কিনারা নেই। এমনিতে মনে হয়, এক আধটু দুই নম্বরি করলেই অগাধ কাঁচা পয়সার মালিক হওয়া যায়। কিন্তু যে করে, সেই বুঝে- আসলে কাজটা কত কঠিন।

রাজাপুরের ইতিকথা এবং ‘বোতল’ উপহারঃ
হঠাৎ বোরহানের মনে পড়ে যায় বাল্যবন্ধু শুমারের কথা। রাজাপুর গ্রামের ভারতীয় অংশে শুমারদের বাড়ি।
[এখানে একটু জানা প্রয়োজন যে, আগে ভারত বিভাগের পূর্বে বৃহত্তর সিলেটের একটি সমৃদ্ধ জনপদ ছিল এই রাজাপুর গ্রাম। ১৯৪৮ সালে যখন ভারত পাকিস্তান নামে আলাদা দুটি দেশের অভ্যুদয় হয়, তখন আন্তর্জাতিক সীমানাটি টানা হয় রাজাপুর গ্রামের ঠিক মধ্য দিয়ে। দেশের অসংখ্য গ্রাম-শহরের মতো রাজাপুরও দুইভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। দেখা গেল এক ভাইয়ের বাড়ি পড়েছে পূর্ব পাকিস্তানের সুনামগঞ্জ জেলায়, তো অন্য ভাইয়ের বসত পড়ে গেছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মানচিত্রের মধ্যে। যা হোক, ভিন্ন দেশে পড়লেও আত্মীয়স্বজন, পাড়াপড়শীদের মধ্যে যোগাযোগ, আসা-যাওয়া অল্প-বিস্তর ছিলই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সীমান্তে ভারত কর্তৃক কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হলে হঠাৎ করে সর্বনিম্ন যোগাযোগের উপায়টাও বন্ধ হয়ে যায়। এখনকার অবৈধ যোগাযোগ কাটাতারের বেড়া টপকে, অনেক ঝুঁকি নিয়ে।]
গারো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত শুমার সাংমা (২৪) বোরহানের বাল্যবন্ধু হবার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তির পার্টনারও বটেন।পেশায় তিনি মাদক ব্যবসায়ী। বারকয়েক ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকও হয়েছেন এই অভিযোগে। বন্ধুদের মধ্যে উপহার আদানপ্রদানের সংস্কৃতি অনুযায়ী বন্ধুবৎসল শুমার বোরহানকে উপহারও দেন। এখানে তাজ্জবের ব্যাপার হলো, তার একমাত্র উপহারের বস্তু হলো মদের বোতল। মাঝেমধ্যে বন্ধুর জন্য উপহার হিসেবে এক-দুই বোতল মদ পাঠিয়ে দিয়ে থাকেন মাদকব্যবসায়ী শুমার।

পাইপলাইন স্ট্যাটেজিঃ
দুইবন্ধু মদের গ্লাস হাতে নিয়ে ভাবতে থাকেন। ভাগ্য ফেরানোর কিছু একটা উপায় বের তো করতেই হবে। এভাবে গরুছাগলের জীবন আর কতো! চেষ্টায় কি না হয়! অবশেষে দুই বন্ধুর প্রত্যাশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ খুব চমৎকার একটা উপায় বের হয়ে যায়। ভারত বাংলাদেশের মধ্যে এক অভূতপূর্ব অন্যরকম আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী মাছ ব্যবসায়ী বোরহান এখন থেকে বাংলাদেশের আড়তে মাছ বিক্রি না করে বন্ধু শুমারের মাধ্যমে ভারতে মাছ সাপ্লাই দিবেন। আর এই মাছের মূল্যও আবার কোন টাকা বা রুপির মাধ্যমে পরিশোধ হবে না৷ মাছের দাম বাবদ শুমার বোরহানকে দিবেন সমমূল্যের নেশা কারক ইয়াবা ট্যাবলেট। কিন্তু পরিকল্পনা করলেই তো আর কাজটা করা যাচ্ছে না। মাঝে যে কাঁটাতারের বেড়া! এ বেড়া টপকে আন্তঃদেশীয় মাছ এবং ইয়াবা আদান-প্রদান কঠিনসাধ্য কাজ বটে। মাথা খাটিয়ে এ সমস্যার সমাধানও বের করে ফেলেন দুই বন্ধু। স্থানীয় বাজারের স্যানিটারি দোকান থেকে মোটাপাইপ কেনা হবে। এখন পাইপটি কাঁটাতারের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে এর এ প্রান্তের চোঙ্গে বাংলাদেশি মাছ ঢেলে দেওয়া হলে তা কোনরকম পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই ও প্রান্তে ভারতীয় মাছ হয়ে পৌঁছে যাবে।

ডাবল লাভের ব্যবসাঃ
পরিকল্পনা মাফিক কাজও শুরু হয়ে যায়। প্রথম প্রথম একটু একটু ডরডর লাগত। যদি বিজিবি ধরে নিয়ে যায়! যদি বিএসএফ গুলি করে দেয়!! কিছুদিনের মধ্যেই সব ডরভয় দূর করে একেবারে সাবলীল হয়ে ওঠেন সাবেক মাছ ব্যবসায়ী আর বর্তমানের আন্তর্জাতিক স্তরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন। ইয়াবা বিক্রির বিনিময়ে পাওয়া মাছ শুমার ভারতের বিভিন্ন আড়তে বিক্রি করেন। অন্যদিকে মাছ বিক্রির দাম হিসেবে পাওয়া ইয়াবা বোরহান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চালান হিসেবে পাঠাতে থাকেন। ভারতে মাছ বেচে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি দাম পাওয়া যায়। আবার অন্যদিকে মাছের মূল্য হিসেবে প্রাপ্ত ইয়াবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রয়মূল্যের দশগুণ পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এ যেন লাভের উপর ডাবল লাভ। এভাবে অভিনব কৌশলে গত কয়েক বছর ধরে চলে আসছিল ভারত বাংলাদেশের দুই বন্ধুর এই সৃষ্টিশীল ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য’।

এবং ধরাঃ
‘অসহায়’ বোরহানের কপালে অবশ্যএই সুদিন বেশি সময় সয়নি। গত রাতে ৫৪৫ পিস ইয়াবাসহ আমাদের কাছে হাতেনাতে আটক হয়ে যান তিনি। সন্ধ্যার ১৫০ কেজি মাছের দাম হিসেবে ইয়াবাগুলো সংগ্রহ করে ক্রেতার নিকট হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু তার আগেই বেরসিক আমাদের হানা! গতকাল রাত ৯ টায় আমাদের টিম একটি মোটরসাইকেলসহ গ্রেপ্তার করি তাকে (মোটরসাইকেলটিও আবার অবৈধ)।
সর্বশেষঃ নিষিদ্ধঘোষিত ইয়াবা ট্যাবলেট বহন ও ব্যবসা করার অভিযোগে তিনি এখন সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের কোন এক হাজতি ওয়ার্ডের বিছানা গরম করছেন।

এদের কাজকর্ম দেখে আর কতো বিস্মিত হব! বিস্মিত হবার ক্ষমতাও মনে হয় অচিরেই লোপ পেয়ে যাবে।।”

বিজ্ঞজনেরা মনে করেন, এহেন অপরাধীরা যদি ভালো কাজের গাইডলাইন পেয়ে বড় হতো তবে হয়তো গল্পটা অন্যরকমও হতে পারত।। তবে সারাদেশে RABএর ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে এমন অভিযান অব্যহত থাকবে জানিয়েছে RAB ৯.

ক্রাইম ডায়রি///ক্রাইম///অপরাধ///জেলা

Total Page Visits: 66753