• বুধবার ( সকাল ৬:৪৮ )
    • ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

প্রসঙ্গ ভূয়া ডাক্তার—–০১ঃ স্পট বগুড়ার শেরপুর

ধারাবাহিক প্রতিবেদন——–১

॥ আব্দুল ওয়াদুদ ॥
বগুড়ার শেরপুরে ভুয়া ডাক্তারে ছেয়ে গেছে। হাতুরে ডাক্তারের ভুতুরে চিকিৎসায় বিপাকে রয়েছে সাধারণ মানুষ। এমনই এক দন্ত প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত সুনীল বিশ্বাসের ভুল চিকিৎসায় গৃহবধুর হাতে পঁচন ধরায় থানায় অভিযোগও হয়েছে।
জানা যায়, গত ২০ এপ্রিল উপজেলার শাহ বন্দেগী ইউনিয়নের দরিমুকুন্দ গ্রামের রফিকুল ইসলামের স্ত্রী রেহেনা বেগম দাঁতের ব্যাথার জন্য সুনীল বিশ্বাসের শেরপুর শহরের হাটখোলা রোডের সীমান্ত ফার্মেসীতে দন্ত চিকিৎসা নিতে আসেন। সুনীল বিশ্বাস দাঁতের ব্যাথা কমানোর জন্য রেহেনা বেগমের ডান হাতে একটি ইনজেক্শন পুশ করে। তারপর থেকে সে আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পরে। এক পর্যায়ে রেহেনা বেগমের হাতে পচনের সৃষ্টি হওয়ায় গত ৮ মে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার বলেন আশংকামুক্ত নয় এবং তার হাতের অপারেশন করতে হবে। এতে অনেক টাকা ব্যায় হবে। এ ঘটনায় ১১ মে শনিবার দুপুরে রেহেনার স্বামী রফিকুল ইসলাম বাদি হয়ে সুনীল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে শেরপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।


অনুসন্ধানে আরো জানাযায়, সুনীল বিশ্বাস স্বীকৃত পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি না থাকলেও নিজেকে ‘ডাঃ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। যা বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইনের পরিপন্থী এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সুনীল বিশ্বাস সাইনবোর্ড, প্রেসক্রিপশন প্যাড, ভিজিটিং কার্ড ইত্যাদিতে ‘ডাঃ সুনীল বিশ্বাস’ লেখা দেখে চিকিৎসা করাতে গিয়ে রোগীরা প্রতারিত হচ্ছেন। তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে সুনীল বিশ্বাস নামের পূর্বে ডাঃ পদবি ব্যবহার করে যাচ্ছেন। এবং সর্বপ্রকার রোগীদের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের টাকা।
সুনীল বিশ্বাস ছাড়াও রেজিষ্ট্রী অফিস চৈতী ডেন্টাল কেয়ার, হাটখোলা রোড সান্ন্যালপাড়া উজ্জল ডেন্টাল কেয়ার, জয় ডেন্টাল কেয়ার, সীমান্ত ডেন্টল কেয়ার, দুধবাজার মা ডেন্টল কেয়ার সহ উপজেলার আনাচে কানাচে প্রায় ৩০/৪০ টি ভূয়া দন্ত চিকিৎসক রয়েছে। একদিকে যেমন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে অকালে মৃত্যু কোলে ঢলে পড়ছেন রোগী। রোগীদের সাথে অবাধে প্রতারণা করে যাচ্ছে। নামের আগে ভুয়া ডিগ্রি লাগিয়ে রোগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই মূল উদ্দেশ্য। রোগীদের ভাল-মন্দ বিবেচনায় নেই। চিকিৎসাসেবা তাদের কাছে হয়ে উঠেছে রোগী মেরে টাকা উপার্জনের কারখানা। এই প্রতারকদের কারণে চিকিৎসা সেক্টরের জন্য বেশ হুমকিস্বরূপ।
সুনীল বিশ্বাসে সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে কিছু চিকিৎসা জ্ঞান অর্জন করে। সেই সীমিত জ্ঞান দিয়ে সুনীল বিশ্বাস নিজের মতো করে দিনের পর দিন চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাতে অনেক রোগী ভুল চিকিৎসার শিকার হয়।
এ ব্যাপারে ডাঃ তন্ময় স্যান্ন্যাল (বিডিএস) জানান, সরকারি অনুমোদন না থাকলেও এ ধরনের চিকিৎসকরা দেশের আনাচে কানাচে চিকিৎসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। কাজ করতে করতে চিকিৎসা শাস্ত্রের উপর ভাল অভিজ্ঞতা অর্জন করে চিকিৎসা এবং নামের আগে ভুয়া ডিগ্রি লাগিয়ে রোগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সকল প্রকার রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে আসছে।
মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ১৯৮০ (১৯৮০ সনের ১৬ নং আইন) রহিতক্রমে কতিপয় সংশোধনীর ২২। (১) এই আইনের অধীন নিবন্ধন ব্যতীত কোন মেডিকেল চিকিৎসক বা ডেন্টাল চিকিৎসক এলোপ্যাথি চিকিৎসা করিতে অথবা নিজেকে মেডিকেল চিকিৎসক, ক্ষেত্রমত, ডেন্টাল চিকিৎসক বলিয়া পরিচয় প্রদান করিতে পারিবেন না। (২) কোন ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর বিধান লংঘন করিলে উক্ত লংঘন হইবে একটি অপরাধ, এবং তজ্জন্য তিনি ৩ (তিন) বৎসর কারাদন্ড অথবা ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন। প্রতারণামূলক প্রতিনিধিত্ব বা নিবন্ধনের দন্ড ২৮। (১) যদি কোন ব্যক্তি প্রতারণার আশ্রয় লইয়া ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে একজন স্বীকৃত মেডিকেল চিকিৎসক বা স্বীকৃত ডেন্টাল চিকিৎসক হিসাবে এই আইনের অধীনে নিবন্ধন, অথবা নিবন্ধন করিবার উদ্যোগ গ্রহণ, অথবা মিথ্যা বা প্রতারণামূলক প্রতিনিধিত্ব প্রকাশ করিবার চেষ্টা করেন অথবা মৌখিক বা লিখিতভাবে উক্তরূপ ঘোষণা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ, এবং তজ্জন্য তিনি ৩ (তিন) বৎসর কারাদন্ড অথবা ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন।
এসকল ভূয়া ডাঃ মেডিক্যাল এ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসা কার্য পরিচালনা করছেন। দন্ত চিকিৎসক সাইনবোর্ড, প্রেসক্রিপশন প্যাড, ভিজিটিং কার্ড ইত্যাদিতে ডাঃ ব্যবহার করছেন, দিনের পর দিন আইনের পরিপন্থী এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে আসছেন। আবার কোন কোন সময় তাদের ব্যবস্থাপত্রে এমন কিছু ঔষধ লিখছেন, যা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ।
এ ব্যাপারে শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. হুমায়ুন কবীর অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরালো করতে হবে। কেহ যদি নামের আগে ভুয়া ডিগ্রি লাগিয়ে রোগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভুল চিকিৎসা প্রদান করে তবে তাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তিযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

ক্রাইম ডায়রি// বিজয় বাংলা অনলাইনের সম্পাদক আকরাম হোসেনের সৌজন্যে ///ক্রাইম

Total Page Visits: 17098