• শনিবার ( রাত ১১:০২ )
    • ২৪শে আগস্ট, ২০১৯ ইং

একটু সহযোগিতা, একটি জীবন দানঃ সুনামগঞ্জ সদর থানার এস আই সোহেল রানার অবদান

মিয়া মোহাম্মদহেলাল উদ্দিন, বিশেষ প্রতিনিধিঃ

দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টান, পুরো জীবনটাই পাল্টে যাবে।

একটু সহযোগিতা, একটি জীবন দান- ❝স্যার আমাকে ভাত দেন, আমি অনেক দিন মাংস দিয়া ভাত খাই না❞ একাধিক বার কথা গুলি বলছিল পিতা-মাতা হারা অনাথ এক ছেলে। নাম আমির উদ্দিন। বয়স ১৯ হবে হয়ত। সুনামগঞ্জ সদর থানাধীন রঙ্গারচর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। ২ বোন ২ ভাই এর মাঝে আমির উদ্দিন ২য়। জন্মের প্রায় ১০/১২ বছর পর মা মারা যায়। বাবার কাছে মানুষ হওয়ার প্রানান্তর চেষ্টা। কিছুদিন বাড়ীর পাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলেও অভাব অনটনের সংসারে যেখানে ভাত জুটানো কষ্টকর সেখানে শিক্ষা গ্রহন ছিল দুষ্প্রাপ্য।

পিতার জীবদ্ধশায় বড় বোনকে বিবাহ দিলেও ভাই বোন ৩ জন নিয়ে ছোট একটি চা দোকানের আয়ের মাধ্যমে সংসার চলত। গত ২ বছর আগে একমাত্র আশ্রদাতা পিতা রাকিব আলীও ৩ ভাই বোনকে এতিম করে না ফেরার দেশে চলে যায়। সংসারে হাল ধরার মত কেহ ছিল না। বিল বাধাড়ে ঘুরাঘুরি, ডাংগুলি আর ফুটবল খেলার নেশায় সংসারের হাল ধরার পরিপক্কতা আমির উদ্দিন এর ছিল না। অভাব যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাড়ায়। ছোট বোন কোন রকমের পিতার চা দোকান চালাইতে শুরু করে। কিছুদিন পর গ্রাম্য কিছু অসাধু লোক চা দোকান থেকে বাকি খেয়ে টাকা পরিশোর না করে চা দোকানকে লাটে তুলে ফেলেছে। বকেয়া টাকা তুলতে না পারায় এবং নিয়মিত চা দোকান করে দুই ভাইকে রান্না করে খাওয়ানো কষ্টকর হয়ে পড়ে বোনের। এক পর্যায়ে দোকান বন্ধ করে দিয়ে বড় বোনের বাড়ীতে চলে যায় ছোট বোন। ছোট ভাইটি অন্যের বাড়ীতে রাখাল হিসেবে কাজে লেগে যায়। এক পর্যায়ে আমির উদ্দিন অসহায় হয়ে পড়ে। কিছুদিন পরিচিত চাচা ও আত্মীয়রা খাবার দিলেও সময়ের ব্যবধানে আর তাহার দুষ্টুমির কারনে তাও বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষুধার জ্বালায় আমির উদ্দিন এক পর্যায়ে মানুষের রান্না ঘরের খাবার চুরি করিতে শুরু করে। খাবারের সময় হয়ে মানুষের রান্না ঘরে ডুকে রান্না করা হাড়িপাতিল চুরি করিয়া তাহার মা বাবার কবরে নিয়া খাইয়া কবরেই ঘুমিয়ে থাকে। এই ভাবে চলতে থাকে আমির উদ্দিনের জীবন। খাবার চুরির কারনে গ্রামের একাধিক বার বিচার শালিশ হয়। বিচার শালিসে তাহাকে বেধরক মারপিটও করা হয়।

অনুমান ৩ মাস পূর্বে একদিন তাহার ঘর ভাংচুর করার কারনে আমির উদ্দিনের একজন চাচা তাহাকে রশি দিয়ে বেঁধে রেখে থানায় সংবাদ দেয়। পরে অফিসার ইনচার্জ সাহেবের নির্দেশ ক্রমে আমি সঙ্গীয় ফোর্স সহ আমির উদ্দিনের বাড়ীতে যাইয়া তাহাকে ঘরের মধ্যে বাধা অবস্থায় পাই। পরে উপস্থিত সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া তাহাকে নিয়ে থানায় আসি। থানায় আনিয়া আমির উদ্দিনের নিকট থেকে জীবনের করুন কাহিনী গুলি শুনি। কিন্তু তাহার কার্যকলাপের কারনে পরদিন ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৫১ ধারা মোতাবেক বিজ্ঞ আদালতে প্রেরন করি। বিবেকের তাড়নায় তাহাকে এক সপ্তাহের মধ্যেই আদালত হইতে জামিন করিয়ে আমার কাছে এনে রাখি। আমির উদ্দিনের অমায়িক চাহনি, ক্ষুধার্থ মুখের ভাষা আমাকে বিচলিত করে ফেলে। দুই দিন রাখিয়া তাহার চাহিদা মত গরু মাংস, মুরগের মাংস দিয়ে ভাত খাওয়াই। পরে আমির উদ্দিনকে নিয়ে তাহার পিতার ভিটায় যাই। নিকটতম আত্মীয় স্বজন সহ গ্রামের লোকজনের শত বাধা নিষেধ উপেক্ষা করিয়া তাহার পিতার বন্ধ দোকান খুলে দেই। ভাঙ্গা চোড়া টিনের বেড়া, ভাঙ্গা চৌকি, আর ৩/৪ টি পুরাতন কাপ একটি পুরাতন কলসি ও একটি হাতল ভাঙ্গা কেতলির সমন্বয়ে চা দোকান খুলে দেই। কিছু একটা করে দেওয়ার প্রানপন চেষ্টায় আর আমির উদ্দিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে তাহাকে সাহায্য শুরু করি। প্রথমে দোকানের মালামাল কিনার জন্য কিছু টাকা দেই। ভাঙ্গা চোড়া দোকানের ভিতরে ৫৮ ভ্যানগাড়ী মাটি দিয়ে শ্রমিকের মাধ্যমে দোকানটি লেপে সমান করে দেই। পরে ১ ডজন কাপ পিরিচ, ভাঙ্গা কলসির পরিবর্তে দুইটি জগ কিনে দেই। দোকানটি চলতে থাকে। আরো ভাল ভাবে চলার জন্য একটি ৩২ ইঞ্জি ভিশন টেলিভিশনের ব্যবস্থা করে দেই। আমির উদ্দিনকে নিয়ম অনুযায়ী দোকান খোলা, বন্ধ সহ দোখাশুনা করার জন্য একই গ্রামের সাদা মনের মানুষ গোলাম রব্বানী ভাইকে নিয়োজিত করে দেই। এক সময়কার ছন্নছাড়া ক্ষুধার্ত আমির উদ্দিন এখন দৈনিক ৩/৪ হাজার টাকার চা, বিস্কিট, পান সুপারি বিক্রয় করতে পারে। প্রায় ১-২ হাজার টাকা লাভ থাকে দোকানে। প্রায় ৩ মাসের ব্যবধানে এতিম আমির উদ্দিনের জীবনের গতি পরিবর্তন হয়ে যায়। যারা এক সময় তাহার থেকে দূরে থাকত আজ তারাই আমির উদ্দিনের বন্ধু। আজ আমির উদ্দিনের চোখে মুখে হাসি লেগেই থাকে। খুবই ভাল লাগে তাহার হাসি দেখে। কিছুদিন পূর্বে কাংলার হাওড় রক্ষা বাধ পরিদর্শনের সময় তাহার দোকানে উপস্থিত হন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের সম্মানীত উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব ইয়াসমিন নাহার রুনা এবং সুনামগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ জনাব মোঃ শহিদুল্লাহ। তাহারাও কিছু সময় আমির উদ্দিনের দোকানে অবস্থান করে তাহার জীবনের পরিবর্তনের গল্প শুনে অভিভূত হন। ভাল থাকুক আমির উদ্দিন। চলতে থাকুক একটু সহযোগিতায় একটি জীবন দান।

এসআই সোহেল রানা
সদর থানা, সুনামগঞ্জ।
সংগৃহীত- ছাতক নিউজ ২৪. কম।

6917total visits,243visits today